দক্ষিণ চট্টগ্রামের তৎকালীন পটিয়ায় সর্বাপেক্ষা প্রাচীণ বিদ্যাপিঠ হলো ১৮৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় এরপর ১৯১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়। তৎপূর্বে এ এলাকায় অন্য কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিলো না। ছোট ছোট পাঠশালা ও মক্তবভিত্তিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কিছু কিছু শিক্ষা দেওয়া হতো, আর আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারের সন্তানেরা চট্টগ্রাম শহরে গিয়ে পড়ালেখা করত। পটিয়া থানার দক্ষিণাংশে বর্তমান চন্দনাইশ থানায় ১৯১৮ সালে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়- গাছবাড়ীয়া নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়-বরমা ত্রাহি মেনকা উচ্চ বিদ্যালয়। এর পূর্বে সাতবাড়ীয়ায় কোনো জুনিয়র বা মাধ্যমিক স্কুল ছিল না।এলাকার অখিকাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনি শেষ করে (ছাত্ররা) পার্শ্ববর্তী গাছবাড়ীয়া, বরমা ও আশেপাশের স্কলে উচ্চতর শ্রেণিতে ভর্তি হতো। তখন বরমা স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত চালু ছিল। ছাত্রদের পড়ালেখার সুযোগ থাকলেও দূরত্বের কারণে এলাকার ছাত্রীদের পক্ষে পড়াশুনা সম্ভব ছিলো না। বিষয়টি অনুভব করতে পেরে তৎকালীন জমিদার শ্রী নাজির কৃষ্ণ চন্দ্র চৌধুরী এলাকার মহিলাদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৮০০ সালের শেষের দিকে বা ১৯০০ সালের প্রথম দিকে কোনো এক সময় তাঁর বাড়ির সামনে পুকুর পাড়ের উত্তর পশ্চিমাংশে একটি প্রাথমিক পর্যায়ে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এর নামকরণ কর হয়-‘‘সাতবাড়ীয়া বালিকা বিদ্যালয়’’ যা এলাকায় নাজির স্কুল নামে খ্যাত ছিল। শ্রী নাজির কৃষ্ঞ চন্দ্র চৌধুরী ১৮৪৪ সালে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১৯১০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তবে, নাজির কৃষ্ণ চৌধুরী সাতবাড়ীয়া বালিকা বিদ্যালয়, বরমা,পাহাড়তলী (রাউজান), সীতাকুণ্ড, হাড়বাং,বান্দরবান ও মহেশখালীতে স্কুল স্থাপন কল্পে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন আনয়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯১০ সালে তার মৃত্যুর পর সাতবাড়ীয়া বালিকা বিদ্যালয়টি কিছু সময় চলমান থাকলেও আনুমানিক ৬০( ষাট) এর দশকের কোনো এক সময় ঘূর্ণিঝড় কিংবা বন্যায় বিদ্যালয়টি প্রাকৃতিক দুযোর্গের কারণে বিলিন হয়ে গেলে শ্রী নাজির কৃষ্ণ চন্দ্র চৌধুরীর পরবর্তী ওয়ারিশগণের মধ্যে ঝগড়া- বিবাদ,দাঙ্গাহাঙ্গামা ও দলাদলির কারণে এবং প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের মধ্যে ঐক্য না থাকায় ক্ষতিগ্রস্থ বিদ্যালয়টি সংস্কার ও মেরামত করে পুনরায় চালু করা হয়নি।বালিকা বিদ্যালয়টি পুনরায় চালু না হওয়ায় উক্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাতবাড়ীয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। উল্লেখ্য যে, আর.এস ১৫৫০ নং দাগের পূর্ব পাশে ১৫৫১ নং দাগ অবস্থিত, উক্ত দাগে একটি পুকুর আছে, যেটি সেবা পুকুর নামে খ্যাত। পুকুরটি এক সময় নাজির পরিবারের মালিকানাধীন ছিল, পুকুরের উত্তর-পশ্চিম পাড়ে- রবিবার ও বৃহস্পতিবার বিকালে হাট বসত যা বর্তমানেও চলমান। নাজির পরিবারের পুকুরের পাড়ে হাট বসতো বিধায় সেটি নাজির হাট নামে পরিচিতি পায়।
ইতোমধ্যে ১৯৩০ সালে সদ্য বি.এ পাস করা জনাব আবদুল জব্বার চৌধুরী ও ভূবন মোহন চৌধুরীর নেতৃত্বে -ছিদ্দিক মোক্তিয়ার, ডা. শান্তিময় চৌধুরী, মনি চৌধুরী, জাফরাবাদের অলি মিয়া মেম্বার, সৈয়দ আহমদ মাষ্টার, নগর পাড়ার মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীসহ সাতবাড়ীয়ার কিছু শিক্ষানুরাগী ও শিক্ষা সচেতন ব্যক্তি নিয়ে অনগ্রসর এই এলাকার জনসাধারণকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার নিমিত্তে সাতবাড়ীয়ায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে,সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করে দিনের পর দিন মিটিং, সলাপরামর্শ, মতবিনিময় করে স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তারই সূত্র ধরে জায়গা প্রাপ্তির জন্য বরমার তৎকালীন জমিদার রজণীকান্তের কাছে স্কুল প্রতিষ্ঠার জায়গার জন্য সাহায্যের প্রস্তাব করলে তিনি মৌখিকভাবে সাতবাড়ীয়া মডেল স্কুলকে ৭৯ শতক জায়গা দান করেন।জায়গা প্রাপ্তির পর এলাকার সর্বস্তরের জনগণের সাহায্যে সহযোগিতা নিয়ে মাটি দিয়ে নির্মাণ করা হয় সাতবাড়ীয়া মডেল স্কুল। মাটির তৈরী স্কুলঘরটিকে অধিকাংশ অর্থ ব্যয় করেন ভূবন মোহন চৌধুরী। যেখানে প্রাথমিকভাবে ছোট পাঠশালার মধ্য দিয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যক্রম চালু করা হয়। রজনীকান্ত কর্তৃক দানকৃত জায়গাটি স্কুল প্রতিষ্ঠানের নামে জরিপ হতে ভূমি অফিস কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো আপত্তি না থাকায় আর.এস জরিপের সময় সাতবাড়ীয়া মডেল স্কুলের নামে ২২৯নং খতিয়ান মূলে ১৫৫০নং দাগটি চূড়ান্ত রেকর্ডভূক্ত হয়ে প্রচারিত হয়। কিন্তু সাতবাড়ীয়া মডেল স্কুল কর্তৃপক্ষ অসাবধানতাবসত সন সন খাজনা পরিশোধ না করায় ১৯৩৯-৪০ সনের কোনো একসময় উক্ত জায়গা নিলামে উঠে। নিলামকৃত জায়গাটি সাতবাড়ীয়ার ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান জনাব আবদুল্লাহ মিয়া চৌধুরী, পিতাঃ- গোলাম কাদের, সাং- সাতবাড়ীয়া, পটিয়া,বর্তমান চন্দনাইশ,চট্টগ্রাম নিলাম খরিদ করেন।নিলাম খরিদের পর সংবাদটি এলাকায় প্রকাশিত হলে বিদ্যালয়টির নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম অচল অবস্থার সৃষ্টি হয়।এক পর্যায়ে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে,এডভোকেট আবদুল জব্বার চৌধুরী পুনরায়- ১৯৪৫ সালের শেষের দিকে এলাকার কিছু সচেতন মহলকে নিয়ে স্কুল রক্ষার একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ ব্যাপারে জনাব এডভোকেট আবদুল জব্বার চৌধুরী নিলাম খরিদ গ্রহীতা জনাব আবদুল্লাহ মিয়া চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করে স্কুলের নামে নিলামকৃত ৭৯ শতক জায়গা কোমলমতি শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনের কথা বিবেচনা করে এলাকার স্বার্থে দান করার অনুরোধ করেন।